তিলক সেনগুপ্ত, বীরচন্দ্রপুর :-শ্রী শ্রী নিত্যানন্দ জন্মস্থান আশ্রম তথা "নিতাই বাড়ি"র স্বার্থক রূপকার শ্রীজীবশরন দাস লোকান্তরিত হলেন। কোলকাতায চিকিৎসা চলাকালীন গত ১৫ই আগস্ট বিকাল ৪.১৫ মিনিটে তাঁর মহাপ্রয়ান ঘটে। উনপঞ্চাশ বছর তিনি নিতাইবাড়ি আশ্রমের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্মস্থানকে সারা পৃথিবীর বুকে পরিচিতি দেন এই বৈষ্ণব সাধক। তাঁর প্রয়ানে বৈষ্ণব জগতের এক অপূরনীয ক্ষতি হয়ে গেল। পরদিন সন্ধ্যায় যথাযোগ্য মর্যাদায় নিতাইবাড়িতে তাঁর পুতদেহ সমাহিত করা হয়। তাঁর প্রয়ানে শোকের ছায়া সমগ্র বৈষ্ণব জগতে।
বীরভূমের ময়ূরেশ্বর ব্লকের ডাবুক পঞ্চায়েতের অন্যতম গ্রাম বীরচন্দ্রপুর, যে গ্রামে আজ থেকে ৫৪৭ বছর আগে পিতা হাড়াই পন্ডিতের ঘরে ও মা পদ্মাবতীর গর্ভে আবির্ভূত হন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু।
যে বাড়িতে বসবাস করতেন হাড়াই পন্ডিত সেই বাড়িটি আজও অবিকৃত। নিত্যানন্দের জন্মভূমি তথা আবির্ভাব স্থানটি, আজও সুচিহ্নিত। যা সূতিকা মন্দির বা আঁতুড় ঘর নামে খ্যাত। পরবর্তী কালে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সেই পৈতৃক বাড়িটি নিত্যানন্দ জন্মস্থান আশ্রম তথা নিতাইবাড়ি রূপে সারা পৃথিবীর বৈষ্ণব সমাজের কাছে সমাদৃত হয়ে ওঠে।
সেই নিতাই বাড়ি আশ্রমের দ্বাদশ মঠাধ্যক্ষ রূপে আজ থেকে উনপঞ্চাশ বছর আগে দায়িত্বভার গ্রহন করেন এক সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী শ্রীজীবশরন দাস। কলকাতা বরাহনগর শ্রীপাঠবাড়ি আশ্রমের বিশিষ্ট সাধক, নামাচার্য শ্রীরামদাস বাবাজী মহাশয়ের মন্ত্রশিষ্য শ্রীজীবশরন দাস নিতাই বাড়ির দায়িত্ব নিয়ে এলেন তখন। প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দীর নিরলস প্রচেষ্টায় আজ নিতাইবাড়ি আশ্রমে যে প্রভু নিত্যানন্দের মন্দির তৈরি হয়েছে তা সারা বীরভূমের সর্ববৃহৎ সুউচ্চ মন্দির। নয় চূডা বিশিষ্ট সুবিশাল উড়িষ্যার জগন্নাথ মন্দিরের আদলে এবং বাংলার মন্দির শৈলীর মিশ্রনে নির্মিত হয়েছে মন্দিরটি। আজ বীরভূমের পর্যটন মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল স্থান বীরচন্দ্রপুর নিতাইবাড়ি।
নিতাই বাড়িতে শুধু মন্দির নির্মাণ নয়, তৈরি হয়েছে বৈষ্ণব সাহিত্যের অমূল্য গ্রন্থ সম্ভারে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার।বৈষ্ণব সাধকদের ব্যবহৃত সামগ্রীর প্রদর্শনীক্ষেত্র, নিত্যানন্দ রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর মত একাধিক প্রকল্প রূপদানের প্রচেষ্টায় ছিলেন শ্রীজীবশরন দাস।
আশ্রম থেকে শ্রীজীবশরন দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় আশ্রমের ত্রৈমাসিক মুখপত্র 'উত্তরন'।যা সারা দেশের বৈষ্ণব সমাজের কাছে একান্ত ভাবে সমাদৃত। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর ভাবাদর্শ প্রচারে প্রতি বছর প্রকাশিত হয় গবেষনা মূলক গ্রন্থ 'ধীমহি'।এছাড়াও প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ প্রণয়ন শ্রীজীবশরন দাসের অমর কীর্তি।
বৈষ্ণব সাহিত্যে যে রস কীর্তনের উল্লেখ রয়েছে, তার এক বিখ্যাত কীর্তন সেবক শ্রীজীবশরন দাস। তাঁর মহাপ্রয়ানে বাংলার বৈষ্ণব জগৎ এক অবিভাবককে হারালো।কলকাতার বরাহনগর শ্রীপাঠবাড়ি আশ্রমের পন্ডিত প্রবর শ্রী মাধবানন্দ দাস বাবা বলেন, "শুধু নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায় নয়, সমগ্র জাতি এক অভিভাবক কে হারালো।"
তবে শুধু বাংলা নয় বৈষ্ণব তীর্থ ভূমি বৃন্দাবন ও উড়িষ্যা বিভিন্ন মঠ মন্দিরের সাধকরা আজ শোকাহত। পুরীর শ্রী ঝাঁজপিটা মঠের অধ্যক্ষ শ্রী সচ্চিদানন্দ দাস বাবা বলেন, "আমরা মর্মাহত এবং শোকাহত। উনি আমাদের কাছে বটবৃক্ষসম।"
শ্রী ধাম বৃন্দাবনের শ্রী রাধাকুন্ডের বৈষ্ণব সাধক, পন্ডিত শ্রী বৈষ্ণবপদ দাস বাবাজী বলেন, "এই ক্ষতি সমগ্র বৈষ্ণব সাহিত্যের ক্ষতি।"
বাংলা জুড়ে যে বিভিন্ন চৈতন্য পরিকর দের শ্রীপাট রয়েছে। সেই সব স্থানের বর্তমান আচার্যরা ও আজ তার মহাপ্রয়ানে শোকাহত।
শ্রীখন্ড মধুমতী সমিতির অধ্যক্ষ প্রকাশানন্দ ঠাকুর বলেন, "শ্রীখন্ডের আত্মজন, শ্রীজীব শরন দাসের লোকান্তরিত হওয়ায় আমরা বাকরুদ্ধ। প্রিয়জন, নিজজন কে হারিয়ে আমরা ব্যথিত।"
No comments:
Post a Comment