মেয়েটির নাম পায়েল মন্ডল। ময়ূরেশ্বরের ঢেকা গ্রামে বাড়ি। বাবা প্রান্তিক চাষি। সবে কলেজে পা রেখেছে। কন্যাশ্রী প্রকল্পে পাওয়া ২৫ হাজার টাকা আর কয়েকটা টিউশানি সম্বল করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। না , পড়াশোনাতে আহামরি কিছু নয়। নাচ , গান , নাটকেও তেমন কিছু পারদর্শিনীও নয়। জুডো - ক্যারাটেতেও কাউকে ঘায়েল করে নি সে। তবু সে এক অন্যরকম অনমনীয় মনোভাবে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। বছর খানেক আগে একটি বাইক দুর্ঘটনায় তার বাবার পা ভেঙে যায়। বার তিনেক অপারেশানের পরও পা সারে না। নিঃশেষ হয়ে যায় সমস্ত সঞ্চয়। ফের পায়ে ইনফেকশন দেখা দেয়। বাবা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর চিকিৎসা করিয়ে ছেলে-মেয়েদের পথে বসাতে চান নি তিনি। আত্মীয় স্বজনেরাও অধিকাংশই শুকনো উপদেশ ছাড়া কিছু দেন নি। পিঠোপিঠি দাদাও দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মনোবল হারায় নি পায়েল। সে শুনেছিল ভেলোর , ব্যাংগালোরে উন্নত চিকিৎসা হয়। কন্যাশ্রীর ২৫ হাজার আর এদিক - ওদিক করে মোট ৬০ হাজার টাকা সম্বল করে দাদার সংগে বাবাকে সে ব্যাংগালোরে পাঠিয়ে দেয়। পরীক্ষা নিরক্ষার পর ডাক্তাররা জানিয়ে দেন খুব শীঘ্রই অপারেশান করাতে হবে। খরচ পড়বে ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। ততক্ষণে নিয়ে যাওয়া টাকাও প্রায় নি:শেষ। আকাশ ভেঙে পড়ে সবার মাথায়। মেয়েটির বাবা জানিয়ে দেন এত টাকা খরচ করে অপারেশন করাবেন না। করাবেনই বা কি করে ? সঞ্চয় নেই , যৎসামান্য জমি বিক্রি করে দিলে পেটই বা চলবে কি করে , মেয়ের বিয়েই বা দেবেন কি করে ? যে ক'টা দিন বাঁচবেন ওইভাবেই চালিয়ে দেবেন। তাই অপারেশন না করিয়েই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু হাল ছাড়ে নি মেয়েটি। সবার কাছে বাবার চিকিৎসার জন্য ধার হিসাবে সাহায্য চায় সে। প্রথমেই সে ধরে আত্মীয় স্বজনদের। তারা অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নেন। উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে মেয়েটি। যতদিন যাচ্ছে ততই টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে , বেড়ে যাচ্ছে বাবার পায়ের ইনফেকশন। তবু সে হাল ছাড়ে না। চেনাশোনা সবার কাছে সে তার সমস্যার কথা জানায়। দান কিম্বা ভিক্ষা নয় , সে ধারের আর্জি জানায়। কাজ হয় তাতেই। ৫/১০ হাজার করে সংগৃহিত হয় প্রয়োজনীয় টাকা। সেই টাকা সে পাঠিয়ে দেয়। তা দিয়েই গত রাতে অপারেশান হয়েছে তার বাবার। এ হয়তো নেহাতই ব্যক্তিগত একটি বিষয়। হয়তো তাই! কিন্তু কিছুই কি শিক্ষণীয় নয় ? আজও যখন কন্যা সন্তান অবহেলিত , তখন ওইরকম একটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ের এহেন উদ্যোগ কোন পুত্র সন্তানের চেয়ে কম কি ? আসুন প্রার্থনা করি, মেয়েটির বাবা সুস্থ হোক, আর ওই রকম মেয়ে ঘরে ঘরে জন্মাক।
তথ্যচিত্র-রানা বৈদ্য
No comments:
Post a Comment